খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৪ সাল থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চলছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সরাসারি যোগাযোগ স্থাপনকারী এই বন্দর দিয়ে প্রতিদি হিমায়িত মাছ, পাথর, সিমেন্ড, রড, আটা-ময়দা ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়। তবে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে প্লাস্টিক ফার্নিচার, পিভিসি সামগ্রী, তুলা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফল ও ফলের স্বাদযুক্ত জুসের মতো উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন কয়েকটি পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
মূলত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণে দুইদেশের মধ্যে কূটনৈতিক যে টানাপোড়েন তৈরি হয়- তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি বাণিজ্যে। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সেখানকার ব্যবাসায়ীদের বাংলাদেশের পণ্য আমদানি না করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। একপর্যায়ে গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশের কিছু স্থলবন্দর দিয়ে বেশ কয়েকটি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত সরকার। এতে করে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি কমে আখাউড়া স্থলবন্দরে।
এদিকে, ভারত থেকে পণ্য আমদানি অনিয়মিত হওয়ার কারণে রাজস্ব আয় কমেছে বন্দর ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের। মূলত বন্দর দিয়ে ভারত থেকে যেসব পণ্য আনার অনুমতি রয়েছে- তার বেশিরভাগই ত্রিপুরার বাইরে থেকে আনতে হয়। এর ফলে আমদানি ব্যায় মিটিয়ে ভালো মুনাফা করতে না পারায় আমদানিতে অনীহা ব্যবসায়ীদের। তবে তারা বলছে, যদি সবধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় বাজারে যখন যে পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে, সেই পণ্য আমদানি করবেন তারা।
আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশনের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে গত মার্চ পর্যন্ত আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ৪৩৭ কোটি ১৮ লক্ষ ৯৪ হাজার টাকা মূল্যের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে হিমায়িত মাছ, সিমেন্ট, শুটকি, পাথর, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য। একই সময়ে ভারত থেকে আমদানি হয়ে মাত্র ১ কোটি ৯৬ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকার চাল, জিরা ও আগরবাতি। এ থেকে সরকারের রাজস্ব এসেছে ৭১ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল ৫১৪ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকার পণ্য এবং আমদানি হয় ৭ কোটি ৩১ লক্ষ টাকার পণ্য।
তবে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দুইদেশের সম্পর্কের তিক্ততা ধীরে ধীরে কাটছে। ফলে এখন ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন পণ্যগুলোর ওপর থেকে আমদানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ব্যতিত সবধরনের পণ্য বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানির অনুমতিও চান তারা।
আখাউড়া স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী রাজীব ভূঁইয়া বলেন, অভ্যুত্থানের পর দুইদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছিল, তা এখনও অনেকটাই কমেছে। এর ফলে ধীরে ধীরে বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি বাড়ছে। তবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পণ্যগুলো পুনরায় রপ্তানির অনুমোদন পেলে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয় বাড়বে। এতে করে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবে, তেমনি সরকারেরও বিপুল বৈদেশিক মুত্রা অর্জন হবে।
আখাউড়া স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আমরা ভারতে নতুন কিছু পণ্য রপ্তানির চেষ্টা করছি। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এছাড়া যদি আমাদের সব পণ্য আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে বন্দর দিয়ে ফের পণ্য আমদানি শুরু হবে এবং সরকারেরও রাজস্ব বাড়বে।
এ বিষয়ে আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার কাজী আল মাসুম বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের সবধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। যেসব পণ্যের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আছে, সেগুলো বেশি পরিমাণে রপ্তানি হতো। ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দুইদেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা অচিরেই প্রত্যাহার হবে।